শনিবার , জানুয়ারি ২২ ২০২২

হাজার টাকার নোট

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম

এক হাজার টাকার নোট নাকি পাঁচশ টাকার নোট দিব স্যার বলেই চশমার ফাক দিয়ে ব্যাংকের ম্যানেজার রফিক সাহেব তাকালেন।
আরে , লক ডাউনের সময় , কোয়ারেন্টাইনে আছি। বাজার ঘাট কোথাও যাচ্ছি না। যত খুচরো হয় ততই সুবিধা। টাকা ভাংগানোর ঝামেলায় আবারো বাইরে যাওয়া যাবে না। আর শোনেন নতুন নোট দিতে পারবেন।

স্যার নতুন নোট নিতে গেলে একটু বসতে হবে। কর্পোরেট শাখায় আনতে পাঠিয়েছি।

  • আসসালামু আলায়কুম প্রফেসর সাহেব। আরে অভাব বেড়ে যাবে । যাকে যা দিবেন আর ফেরত পাবেন না। সব খুচরো নোট নিয়ে নেন বলেই ড. পলাশ খালি চেয়ারটায় বসে পড়লেন।

আরে ড. পলাশ আপনিও চলে এসেছেন।

না এসে উপায় আছে এই লকডাউনে ব্যাংকে বেশ আড্ডা চলছে। খবর পেয়েই চলে এলাম। রফিকের সঙ্গে খুব গল্প করছেন দেখছি।
কেমন আছেন রফিক সাহেব ? ব্যাংকের খবর সবর সব ভাল তো? টাকা পয়সা আছে তো?

আরে আড্ডা কোথায়? ঠেকায় পড়ে এলাম। দু মাস তো ঘরে যা ছিল তাই দিয়ে চললাম। এখন তো তবুও বাচা। বিদ্যুৎ বিল, টেলিফোন বিল সবই তো ওই মোবাইলেই পেমেন্ট। বিকাশ না কি যেন বলে।

আরে ভাই আমি তো বলি টাকা বিকাশ করা না। টাকা বিদায় করা। বলেই হাসতে থাকেন পলাশ সাহেব।

বিকাশ আর বিদায় শব্দ দুটোর তো ভারি মিল। পলাশ তোমরা সাহিত্যের লোক। পারোও বটে।

ম্যানেজার বিষাদ কন্ঠে বলতে থাকেন স্যার আপনারা তো আরামেই আছেন। মোবাইল পেমেন্ট নিয়ে বাসায় লকডাউনে। আমাদের কথা একবার ভাবুন তো। এই তো কয়দিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমার সহকর্মী মারা গেলেন। কতটুকু কি করতে পারলাম।

হ্যা ওই দিনই পেপারে পড়লাম। আপনাকে ফোনও দিয়েছিলাম। কিন্তু আসলেই পরিস্থিতি যে কোনদিকে যাচ্ছে। পলাশ বলেই আলোচনা গুরু গম্ভীর করার চেষ্ঠা করলো।

এখন বলেন তো উনি কি সতর্ক ছিলেন না?

সতর্ক থেকেও কোন লাভ হয়নি স্যার। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে চলে গেলেন। সহকর্মী হয়েও আমরা কিছুই করতে পারলাম না। ম্যানেজার রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকে মারা যাবার দুদিন আগেও টানা দু ঘন্টা এসে ব্যাংকের কাউন্টার সামলিয়েছে।

অল্প অল্প জ্বর বলে ডাক্তারের কাছেও গেছে। শুনেছিলাম কোভিড ১৯ টেস্টও করিয়েছিল। কিন্তু কি করে যে কী হলো।

এরপর কী হলো ভয়ার্তভাবে শোনার আগ্রহ বেড়ে যায় ড. পলাশের।

শেষমেশ জ্বর যাচ্ছে না বলে সেই সে নিজে নিজে কাল সকাল দশটায় গেল কোভিড-১৯ কেসের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালটাতে। ডাক্তাররা তার সার্বিক লক্ষণ দেখে তাকে তৎক্ষণাৎ ভর্তি করে নিলেন। তারপর ওখান থেকেই সে দুপুরে স্বাভাবিক কথা বলল আমাদের সাথে, রাত দশটায় এক ঘন্টা কথা বলল তার স্ত্রীর সঙ্গে, বলল “ঘুমাতে যাচ্ছি”, তারপর আমরা শুনছি রাত একটার পর থেকে দ্রুত পরিস্থিতি খারাপ হতে লাগল তার, আইসিইউ-তে নেওয়া হলো তাকে এবং সে মারা গেল ভোর পাঁচটার কাছাকাছি কোনো এক সময়। খসখসে গলায় ম্যানজোর রফকি সহর্কমীর মৃত্যুর কথা বলতে থাকে । সবচয়ে কষ্টের বিষয় জোহরের নামাজের পরে তাকে দাফন করা হলো তিলতলা গোরস্থানে, পরিবারের কাউকেই তাদেরই নিরাপত্তার স্বার্থে থাকতে দেওয়া হলো না পাশে, তারা কেউই একবারের জন্যও দেখতে পেল না । হতভাগ্য!

এমন ঘাতক যে এই চল্লিশ বছর বয়সের হাসিখুশি ছেলেটার জীবন কে নেবে এভাবে আকস্মিক, মাত্র এক রাতের মধ্যে, সাত দিনের সাধারণ এক না-ঘাবড়ানো-মতো জ্বরের শেষে?

এখানেই আমার ভয় যে আমরা পারব তো এই ভয়ঙ্কর ঘাতককে মোকাবিলা করতে?

ম্যানেজার রফিকের ভেঙ্গে পড়া দেখে সাহস দিয়ে বললাম মোকাবিলাতে করতেই হবে। জলজ্যান্ত মানুষ যদি এক দিনের মধ্যে এই ভাইরাসের ঝড়ে কাত হয়ে যেতে পারে তো,কি করবেন। চুপ করে বসে থাকবেন। মোকাবিলাতে করতেই হবে।

জানি না। তবে আমি ভাই ঘরের দাওয়াই শুরু করেছি। মধু আর কালোজিরার তেল একসাথে দিনে তিনবার। আবার গিন্নী গরুর দুধে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে দিচ্ছে রাতে শোবার আগে। সেই সাথে নিম চা।
পলাশের কথাগুলো অন্য সময় হলে রসিকতা বলে ধরে নেয়া যেত। কিন্তু এখন তো সিরিয়াস সময়। দু:সময়। বড্ড দু:সময়!

আরে ভাই যা খুশী খেতে ইচ্ছে করে খেয়ে যান। কিন্তু মনে রাখবেন কোভিড-১৯ একটি শ্বাসতন্ত্র সম্পর্কিত ভাইরাস। এটি খদ্যবাহিত নয়। এজন্য বিশেষ কোনো খাবার বা আমিষ বেশী পরিমাণে খেলেই কোভিড ১৯ সারবে এমনটি নয়। বরং ডাক্তাররা যেটা বলছেন সেটাই করুন।

লবণ মেশানো গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করতে পারেন। আদা লেবুর চা খাওয়া যেতে পারে। বারবার সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন। বাইরে যাবার আগে মাস্ক গ্লাভস পরে বের হন। হাল্কা ব্যায়াম করেন যাতে ফুসফুস থাকে শক্তিশালী ও সচল। আর সোশাল ডিসট্যান্সিংটা খুব জরুরী।

কিন্তু আমরা কি সোশাল ডিসট্যান্সিং এর নিয়মগুলো কি মেনে চলছি। ব্যাংকেই দেখুন না মানুষ কথা বলছে মানুষের মুখের ওপরে ঠেলে উঠে এসে, গায়ের মধ্যে ঢুকে এসে, শরীরের ওপরে লাফিয়ে এসে। আজব আমরা!নিজেও মরছি, অন্যকেও মারছি।

ম্যানেজার বললেন স্যার ঠিক বলেছেন। এদের সেবা দিতে এসেই তাবরেজের মতো ছেলেকে আমরা হারালাম!
হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন। তাবরেজ সব সময়ই আমাকে নতুন নোটের বান্ডিল দিত। বলত স্যার নতুন নোট নেন। এতে ময়লা জীবাণু কম থাকে। ইশ্ শেষ পযন্ত ওই ছেলেটাই জীবাণুর হাতে পরাস্ত!

আচ্ছা স্যার আপনি তো মেডিকেল সায়েন্সের অধ্যাপক। একটু বুঝিয়ে বলেন তো কোনটা সাধারণ ফ্লু আর কোনটা করোনার উপসর্গ।
হ্যাঁ তাহলে শুনুন। সর্দি কাশি মানে এ্যালার্জিও হতে পারে। মনে রাখতে হবে সর্দি কাশিসহ জ্বর হচ্ছে সাধারণ ফ্লু এর লক্ষণ। তবে কাশি এবং জ্বরের সাথে শ্বাসকষ্ট হলো করোনা ভাইরাসের লক্ষণ। সেক্ষেত্রে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

একটা কথা বলব স্যার? আপনারা সব শিক্ষিত বড় মানুষ ম্যানেজার আগ্রহ নিয়ে কথাটা বলতে চায়।

কি কথা বলে ফেলেন।

না বলছিলাম মানে এই ভাইরাস নাকি চীন ইচ্ছা করে ছড়িয়েছে।

ও: এই কথা । এটাতো ট্রাম্প বলেই ফেলেছেন। আপনার বক্তব্য ট্রাম্প শুনলে খুশী হবে। ড. পলাশ বলেই হো হো করে হাসতে থাকে।

দেখেন রোগেরও রাজনীতি, কূটনীতি বা ডিপ্লোম্যাসী আছে। স্প্যানিশ ফ্লুর কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল এই সময়ে ওই মহামারি ভাইরাসে ১০ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। এই মহামারীর নাম স্প্যানিশ ফ্লু হলেও স্প্যানিশরা কিন্তু এই ভাইরাসের জন্য দায়ী ছিল না।

পলাশ সাহেব আরো যোগ করে বললেন হ্যাঁ এই স্প্যানিশ ফ্লুও ছিল করেনা ভাইরাসের মতোই মারাত্মক। সংক্রমণের লক্ষণ ছিল জ্বর ও শ্বাস কষ্ট। কেউ হয়তো সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর খানিকটা অসুস্থতা বোধ করেছেন। আবার ঠিক হয়ে নাস্তা সেরে অফিসে যাবার পথেই মারা গেছেন।

ম্যানেজার রফিক বলতে লাগলেন এতে দেখি এখনকার মতোই অবস্থা।

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। ড. পলাশ যোগ করলেন স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ছিল ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন। ধারণা করা হয়, প্রকৃত সংখ্যা পৃথিবীর দুটি বিশ্বযুদ্ধের সম্মিলিত মৃতের সংখ্যা থেকেও ছিল বেশি। ভাইরাসটির সংক্রমণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মৃত্যুবরণ করে ছয় লক্ষাধিক মানুষ, যুক্তরাজ্যের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আর স্পেনে তার থেকেও বেশি।

ম্যানেজার রফিক সাহেবের আগ্রহ দেখে বললাম সুযোগ পেলে সারা ই ডেভিস, এডাম কে স্কট আর সিমন রাসটনের লেখা ‘ ডিজিজ ডিপ্লোম্যাসী, ইন্টারন্যাশনাল নর্মস এন্ড গ্লোবাল হেলথ সিক্যুরিটি’ বইটা একটু পড়ে দেখবেন। ভাইরাস নিয়ে বিভিন্ন রোগ যেমন ইবোলা, সার্স, মার্স, এইচ১এন১ রোগ কিভাবে কখন প্রার্দুভাব ঘটেছে।
ব্শ্বি স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা নানা তথ্য উপাত্তে ভরা বইতে আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। মানুষ অনেক মহামারী-অতিমারী রোগ শোক সামলে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে। সব কথা হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখাও হয়নি।

আশায় মানুষ বাঁচে। কাউকে না কাউকে এগিয়ে যেতে হয়। বিপদ জেনেও কিন্তু আপনি অফিস করছেন । বাঁচার আশায় কত কিছু করতে হয়। এই যে আমি আপনার নতুন চকচকে এক হাজার টাকার নোটের আশায় বসে আছি। এরপর ঠিকই বাজার থেকে এটা ওটা নিয়ে ঘরে ফিরব। কিন্তু কোনটাতে যে মরণঘাতির ছোঁয়া নেই কেউ কি বলতে পারবে। সেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথায় জেনে শুনে বিষ করেছি পান। ব্যাংক থেকে যখন ফিরলাম দেখি ম্যানেজার রফিকের ভয়ার্ত চোখ বড্ড বেশী ছলছল করছে!

গল্পকার: উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও দেখুন

কবি নাজনীন নাহারে’র কবিতা ”ইচ্ছে ছিলো”

ইচ্ছে ছিল আমারও খুব ইচ্ছে ছিল; ইচ্ছে ছিল খুবটি করে চুটিয়ে পাটিয়ে প্রেমটি করব। আমার …